মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

জেলার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মেলাসমূহ

গুড়পুকুরের মেলা

লৌকিক আচার-আচরণ, বিশ্বাস আর পৌরাণিকতায় সমৃদ্ধ সাতক্ষীরা। নানা কিংবদন্তির প্রবহমান ধারায় সজীব এখানকার ঐতিহ্য। বঙ্গোপসাগরের আঁচল ছোঁয়া সুন্দরবন, আর সুন্দরবনকে বুকে নিয়ে সমৃদ্ধ এখানকার প্রকৃতি, এমনকি অর্থনীতিও। সুন্দরবনের চোখ জুড়ানো চিত্রল হরিণ, বিশ্ববিখ্যাত ডোরাকাটা বাঘ থেকে শুরু করে বনদেবী, রাজা প্রতাপাদিত্যের জাহাজঘাটা, বিভিন্ন মোঘলীয় কীর্তি, অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, পুরাকালের কাহিনী, জারি-সারি, পালাগান, পালকি গান এসবের মধ্যেই সাতক্ষীরার মানুষের আত্মীক পরিচয় গ্রন্থিত। এখানে জন্মেছেন কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সুফী দরবেশসহ বহু বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব, জন্মেছেন জীবন সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ সাহসী মানুষ। শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর আত্মত্যাগী বীর।

গ্রামবাংলার লোকজ ঐতিহ্যই এখনও পর্যন্ত সাতক্ষীরার সংস্কৃতির মূলধারাটি বহন করে চলেছে। খুব সহজেই এখানে মিলিত হয়েছে লৌকিক আচার-আচরণের সাথে পৌরাণিকত্বের। যেন দুটো নদীর সম্মিলিত এক বেগবান ধারা। বছরের প্রায় প্রতিটি সময় ধরে অগণিত মেলা বসে সাতক্ষীরায়। সাগরদ্বীপ দুবলোর মেলা থেকে শুরু করে খুলনা, যশোর এমনকি পশ্চিমবঙ্গেও এর প্রভাব পরিলক্ষিত। এ জেলার শুধু নয় দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় মেলাটি বসে সাতক্ষীরা শহরেই, পলাশপোলে, গুড়পুকুরের পারে।

গুড়পুকুরের নামানুসারেই মেলার নামকরণ করা হয়েছে গুড়পুকুরের মেলা। মেলাটির বয়স এখনও সঠিকভাবে জানা যায়নি। মেলা নিয়ে অতীতে তেমন লেখালেখিও হয়নি। মেলাটির উৎপত্তি সম্পর্কে সোবাহান খান চৌধুরীর (৮০) বক্তব্য এরকম, ‘অনেক পথ হেঁটেছেন, আজ ক্লান্তিতে পা আর উঠতে চায় না। শেষ ভাদ্রের ভ্যাপসা গরমে মিইয়ে এসেছে সমস্ত শরীর। ওই যে গৌরদের পুকুরপারের বটগাছটা ওর ছায়ায় একটু জিরিয়ে নেয়া যাক। বটের ছায়ায় বসতে না বসতেই ঘুম এসে গেল ফাজেলের, শেকড়ে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি। গাছতলার ঘুম। গাছতলার রোদের মতই ছেঁড়া ফাটা নড়বড়ে। বটের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের তীব্র রশ্মি এসে পড়লো ফাজেলের মুখে। ঘুম ভেঙে যেতে লাগলো, অস্বস্তিবোধ করলেন তিনি। মগডালে বসেছিল এক পদ্মগোখরো সাপ। সে তা লক্ষ্য করলো এবং নেমে এলো নিচে, যে পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যরশ্মি এসে ফাজেলের মুখে পড়েছে ঠিক সেখানে। ফণা তুলে দাঁড়ালো সাপটা। ফণার ছায়া এসে পড়লো ফাজেলের মুখে। তিনি আরাম পেয়ে আবারও ঘুমিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে থাকার পর আবার ঘুম ভেঙে গেলো। এর মধ্যে ক্লান্তি অনেকটা দূর হয়ে গেছে। বটের পাতায় পাতায় দৃষ্টি ঘোরাতে লাগলেন। হঠাৎ দেখতে পেলেন সেই সাপটিকে। তখনও সে ফণা তুলে সূর্যকে আঁড়াল করে আছে। এবার ফণাটা একটু দুলে উঠলো, দুলে উঠলো গাছের পাতারা। ফণা নামিয়ে সাপটি হারিয়ে গেল ডালে ডালে। আবার সূর্যরশ্মি এসে পড়লো ফাজেলের মুখে। তখন তার চোখে ঘুমের রেশমাত্র নেই। শরীরে নেই একবিন্দু ক্লান্তি। ফাজেল বটতলা ত্যাগ করলেন এবং এলাকার হিন্দুদের ডেকে বললেন, ‘এখানে তোমরা মনসা পূজা কর।’

সেদিন ছিল ভাদ্র মাসের শেষদিন। বাংলা ১২ শতকের গোড়ার দিকের কোন এক বছর। তখন থেকে গুড়পুকুরের দক্ষিণ পারের এই বটতলাতেই শুরু হয় মনসা পূজা। আর পূজা উপলক্ষে মেলা। এখন প্রশ্ন হলো সোবাহান খান চৌধুরীর পূর্বপুরুষ ফাজেল খান চৌধুরীর আসল পরিচয় কি?

সে আরও অনেক দিন আগের কথা। তখন বাংলাদেশে সুলতানী শাসন চলছে। বাংলার সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নতুন ধারার সূত্রপাত হয়েছে। ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব। মুসলমান সমর নায়ক ও সৈনিকদের সাথে সাথে এদেশে প্রবেশ করতে শুরু করেছে সাধারণ কর্মচারী, ব্যবসায়ী, ভাগ্যান্বেষী ও সুফী দরবেশ। পীর দরবেশরা এদেশে এসে ধর্ম প্রচারে আত্মনিয়োগ করলেন। সে সময় আরও অনেকের মত এলেন খানজাহান আলীও। বাংলা ৯ম শতকে তিনি বাগেরহাটে ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণ করেন। যা প্রাক মুঘল স্থাপত্যের এক অতুলনীয় নিদর্শন হিসেবে আজও বিদ্যমান। খানজাহান আলী যখন ষাটগম্বুজ মসজিদে অবস্থান নিয়ে ধর্ম প্রচার করতে থাকেন তখন তার দু’জন ব্রাহ্মণ খাজাঞ্চি ছিল। একজনের নাম কামদেব রায় চৌধুরী, জয়দেব রায় চৌধুরী অন্যজন। একদা খানজাহান আলী রোজা থাকা অবস্থায় একটা কমলালেবুর ঘ্রাণ নিচ্ছিলেন, তখন ব্রাহ্মণদ্বয় বললেন, হুজুর আপনিতো আজ রোজা আছেন। এ অবস্থায় কমলার ঘ্রাণ নিলেন, ঘ্রাণে অর্ধভোজন নয় কি? খানজাহান আলী মৃদু হাসলেন, বললেন, তোমাদের সন্দেহ ঠিকই, আমার রোজার আংশিক ক্ষতি হয়েছে। অন্য আর একদিন খানজাহান আলী নিজেই রান্না করছিলেন। ব্রাহ্মণদ্বয় সেখানে হঠাৎ উপস্থিত হয়ে পড়লেন। তারা বললেন, হুজুর আপনি নিশ্চয় মাংস রান্না করছেন, বড়ই সুঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। খানজাহান আলী আবারও মৃদু হাসলেন এবং বললেন, ব্রাহ্মণ মশাইরা তোমরা তো গরুর মাংসের ঘ্রাণ নিয়ে ফেলেছো, এখন ব্রাহ্মণত্বের কি হবে?

কামদেব ও জয়দেব চিন্তায় পড়লেন এবং কয়েকদিন পর খানজাহান আলীর কাছে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন। কামদেবের নাম হলো কামালউদ্দিন খান চৌধুরী আর জয়দেবের জামালউদ্দিন খান চৌধুরী। উল্লেখ্য, এই কামদেব ও জয়দেবের কথা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’ উপন্যাসে বর্ণনা করা হয়েছে। এ দু’জনের মধ্যে কোন একজনের পরবর্তী বংশধর বুড়া খাঁ। বুড়া খাঁ বাগেরহাট থেকে এসে সাতক্ষীরার প্রাণকেন্দ্র পলাশপোলে বাড়িঘর তৈরি করেন। গড়ে তোলেন পলাশপোল চৌধুরী বাড়ী। চৌধুরী বাড়ীর পূর্বপার্শ্বে একটি দরগা তৈরি করে সেখানে ধর্ম সাধনা করতে থাকেন। দরগাটি বিরাট এক বটগাছ কাঁধে করে এখনও টিকে আছে। বুড়া খাঁ তার বংশধরদের রেখে যান পলাশপোল চৌধুরী বাড়ীতে। চৌধুরী বাড়ীর অধীনে তখন পলাশপোল মৌজার বৃহৎ এলাকা। এলাকাবাসী খাজনা দিতো চৌধুরীদের। বর্তমানে সাতক্ষীরা পৌরসভার সবচেয়ে বড় ৯নং ওয়ার্ডই পলাশপোল। সেই বাংলা বারো শতকের কোন এক সময় বুড়া খাঁর বংশধর ফাজেল খান চৌধুরী পলাশপোল এলাকায় খাজনা আদায় করে ফিরছিলেন। সেদিন ছিলো ভাদ্র মাসের শেষ দিন। অর্থাৎ ৩১ তারিখ। পলাশপোল গুড়পুকুর পাড়ের বটতলায় বসেন বিশ্রাম নিতে আর তখনই ঘটে উপরে বর্ণিত ঘটনাটি। সেই থেকে শুরু হল পূজা ও পূজা উপলক্ষে মেলা। কেউ বলেন, মনসার সাথে ওখানে বিশ্বকর্মারও পূজা হয়ে থাকে।

মেলার নাম গুড়পুকুর আর পুকুরের নাম গুড়। এই নামের জট এখনও খোলেনি। কিভাবে হলো এ নামকরণ- কেউ বলেন, মনসা পূজার সময় পুকুরে বাতাসা ফেলা হতো। ওই বাতাসার জন্যে পুকুরের পানি মিষ্টি লাগতো। তখন থেকেই গুড়পুকুর। অনেকের ধারণা পুকুরে পানি থাকতো না বেশিদিন। স্বপ্ন দর্শনে জানা গেলো একশ’ ভাঁড় গুড় ঢালতে হবে পুকুরে। স্বপ্ন নির্দেশ মোতাবেক কাজ করা হলো। সেই যে পুকুরে পানি এলো আর শুকালো না। আবার শোনা যায় পুকুরের তলদেশ থেকে এক সময় মিষ্টি পানি উঠতো তাই এর নাম গুড়পুকুর হয়েছে। একজন বললেন, পুকুরের জায়গাতে অসংখ্য খেজুর গাছ ছিল এবং প্রচুর রস হতো ওই গাছে। একবার গাছের সমস্ত রস দিয়ে গুড় তৈরি করে তা’ বিক্রি করা হলো এবং ওই বিক্রিত টাকা দিয়ে পুকুরটি কাটা হলো। তখন থেকে গুড়পুকুর।

আবদুস সোবাহান খান চৌধুরী বলেছেন, আসলে ওসব কিছু নয়। চৌধুরীপাড়ার রায় চৌধুরীরা গৌর বর্ণের ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাই তাদের পুকুরকে বলা হতো গৌরদের পুকুর। কালক্রমে হয়েছে গুড়পুকুর। পুকুর সংলগ্ন বসবাসকারী নিতাই কর্মকার (৭৫) ও সোবাহান খান চৌধুরীর বিবরণের সাথে ঐকমত্য পোষণ করেন।

সেদিনের গুড়পুকুরের মেলা আজ অনেক বড় হয়ে উঠেছে। মেলানুষ্ঠানের পাঁচ/ছয় মাস আগে থেকেই দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে সাজসাজ রব পড়ে যায়। বিশেষ করে খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরার কলম-চারা ব্যবসায়ী ও কাঠমিস্ত্রি বা ফার্নিচারের কারখানাগুলোতে কাজের তোড়ে ঘুম বিদায় নেয়। এমনকি পশ্চিমবঙ্গেও এর প্রভাব পড়ে। ঢাকা, ফরিদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে স্টেশনারি দোকানদাররা আসে। মূল মেলা ৩১শে ভাদ্র হলেও আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি অব্দি মেলার বেচাকেনা চলে। লাখ লাখ মানুষের সমাগমে ভরপুর হয়ে ওঠে মেলা। গাছের চারা-কলম ও ফার্নিচার ছাড়াও শিশুদের বিভিন্ন খেলনা, আখ, লেবু, ঝুড়ি, ধামা, কুলা, টুকরি, বাটি, দেলকো, শাবল, খোন্তা, দা, ছুরি, কোঁদাল প্রভৃতি বিক্রি হয়ে থাকে। কাঠ ও বাঁশের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র ছাড়াও বেতের ও মাটির তৈরি নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র সুলভে পাওয়া যায়। মেলাতে এসে বাতাবী লেবু ও ইলিশ মাছ না কিনে কেউ বাড়ী ফিরত না। সার্কাস, যাত্রা, পুতুল নাচ, মটর সাইকেল, মৃত্যু কূপ, চরকি, নাগরদোলা, মিষ্টি পান মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল। খুলনা রোড থেকে তুফান কোম্পানীর মোড়, আর নিউ মার্কেট থেকে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক পর্যন্ত মেলা বিস্তৃত থাকলেও পলাশপোল স্কুলের মাঠ ও পলাশপোল গ্রামই মেলার কেন্দ্রস্থল। গত কয়েক বছর ধরে জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা মেলার সার্বিক তত্ত্বাবধান করে আসছে। মাঝে চাঁদা আদায়কারীদের অত্যাচারে অনেক ব্যবসায়ীর মেলা ছাড়বার উপক্রম হয়েছিল। ২০০২ সালে সার্কাস পার্টিতে বোমা হামলার পর মেলাটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। চলতি বছর থেকে ঐতিহ্যবাহী মেলাটি আবারও শুরু হয়েছে। তবে দিন দিন এর লোকজ আবহ হারাচ্ছে।

* সৌজন্যে : ত্রৈমাসিক ঈক্ষণ, আশ্বিন ১৩৯৬।

সদর উপজেলা

 

ধর্মরাজের মেলা

সাতক্ষীরা সদরের আলিপুর ইউনিয়নের গাংনিয়া গ্রামের ধর্মতলায় রাস পূর্ণিমায় এই মেলা শুরু হয়ে প্রায় মাসাধিককাল চলে। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির মূর্তি স্থাপন করে তাকে পূজা দেয়ার মাধ্যমে এই মেলা শুরু হয়। বিন্ধ্যাদেব বিশ্বাস বর্তমানে এই ঠাকুরের পুরোহিত হিসাবে কাজ করছেন। যুধিষ্ঠির হলেন নিরাশ্রয়ী দেবতা। তার নিজের কোন আশ্রয় নেই। তাই বটগাছের নিচে খোলা জায়গায় তার মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। মেলা শেষেও মূর্তি ওভাবেই থেকে যায়। পরের বছর আবার নতুন মূর্তি স্থাপন করা হবে। ধর্মতলার পাড়ুই সম্প্রদায়ের লোকেরা এই পূজানুষ্ঠান করে থাকেন। অনেক প্রাচীন মেলা। কতদিন পুরাতন তা ঐ গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আঃ হামিদও জানেন না, এমনকি তার বাবা-দাদাও বলতে পারেননি।

মেলায় অনেক দূর-দূরান্ত থেকে দোকানীরা আসেন। একজন কাগজের ফুল বিক্রেতা এসেছেন রাজশাহী থেকে। একজন হাতে বা কাপড়ে নকশী ছাপ-এর ছাচ বিক্রি করছেন তিনি এসেছেন গোপালগঞ্জ থেকে। শিশুদের খেলনা ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র, বেত ও বাঁশের সামগ্রী, কাঠের আসবাবপত্র, ঘর সাজানোর জিনিসপত্র, বিভিন্ন ধরণের মিষ্টি যেমন-গজা, বাতাসা, রসগোল্লা, জিলাপী, সন্দেশ সহ চপ, পাপড়, পিঁয়াজী খাবার পাওয়া যায়। নাগরদোলা, চেয়ার ঘূর্ণিসহ বিভিন্ন খেলার আয়োজন। যাত্রা, পুতুল নাচও কয়েক বছর আগে পর্যন্ত এসেছে। নানা মনষ্কামনা পূরণের আশায় অনেক দূর থেকে পূণ্যার্থীরা আসেন। সত্যের সাধক যুধিষ্ঠির। এই দেবতার কাছে তাই সত্যপথ ও ন্যায়পরায়ণ জীবন কামনা করেন পূজারীবৃন্দ। সাতক্ষীরা বাস টার্মিনাল থেকে ভোমরার বাসে উঠে বাদামতলায় নামতে হবে। তারপর অল্প একটু পায়ে হেঁটে মেঠো পথ।

 

শ্মশান মেলা

সাতক্ষীরা সদরের ঝাউডাঙ্গা ও মাধবকাটিতে অনুষ্ঠিত হয় শ্মশান মেলা। কালীপূজা উপলক্ষে শ্মশান মেলা অনুষ্ঠিত হয়। ঝাউডাঙ্গা বাজারের পাশে পৌষ মাসের শেষ ও মাঘ মাসের প্রথম দু’দিন এই তিনদিন বসে শ্মশান মেলা।

মাধবকাটি শ্মশানে কালীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় শ্মশান মেলা। মাঘ মাসের অমাবস্যার দু’দিন এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামীণ লোকশিল্পই মেলার প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে। মেলাগুলোতে কুটির শিল্প দ্রব্য প্রাধান্য পায় বলে কুটির শিল্প বিকাশে মেলা অনুষ্ঠানের গুরুত্ব অপরিসীম।

 

রথের মেলা

সাতক্ষীরা সদরের প্রাণসায়ের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে রথের মেলা চলে আসছে। যদিও বর্তমানে এ মেলাটি অনেকটা ম্রিয়মান হয়ে পড়েছে। রথযাত্রা ও উল্টোরথে বড় বাজার অর্থাৎ প্রাণসায়ার বাজারে রথের মেলা বসতো।

 

 

শীতলা দেবীর পূজা উপলক্ষে মেলা

গোয়ালপোতা, সাতক্ষীরা সদর

চৈত্র মাসের আট তারিখ কিংবা তার সন্নিকটের বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয় শীতলা দেবীর পূজা। পূজা উপলক্ষে হয়ে থাকে মেলা। সাতক্ষীরা সদরের গোয়ালপোতা গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে। পাশেই গোয়ালপোতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। মেলা বিস্তৃত হয় সেখানেও। সাতক্ষীরা শহর থেকে ৫/৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রাম। জানা যায়, বাগান্যে নামের একজন স্বপ্নলাভে জানতে পারেন শীতলা দেবীর পূজা দিলে বসন্ত রোগের প্রতিকার হবে। সেই থেকে এখানে পূজা চালু করা হয় আর পূজা উপলক্ষে মেলা। বাগান্যের পরবর্তী বংশধরেরা এখন এই পূজা করে থাকেন। একদিনের হলেও বেশ জমজমাট এ মেলাটি আমাদের লোকশিল্প সামগ্রীতে ভরে ওঠে। পরিপূর্ণ লোকজ চরিত্রে মেলাটি প্রতি বছর আয়োজিত হচ্ছে। শীতলা দেবীর কাছে জল-মাটি রেখে পূজা দিয়ে সেই জল-মাটি গায়ে মাখলে বসন্ত রোগ মুক্ত হওয়া যায়। মেলায় এসে তাই পূজার জল-মাটি নিয়ে যায় প্রত্যন্ত গ্রামের অসংখ্য মানুষ। মেলাটি বেশ প্রাচীন।

 

 

চড়ক মেলা, ধুলিহর 

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ডিবি ইউনাইটেড মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠ সংলগ্ন কাল ভৈরব মন্দির। এ মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১২৯৭ বঙ্গাব্দে। তখন থেকেই প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তিতে এখানে মেলা বসে। চৈত্র মাসের শেষ তিন দিন মেলা চলে। ধুলিহর-ব্রহ্মরাজপুর স্কুল মাঠ সহ সংলগ্ন মন্দির এলাকা জুড়ে হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় মেলা উৎসব মুখর হয়ে ওঠে। চৈত্র সংক্রান্তিতে কাল ভৈরব ঠাকুরের পূজা হয় আর সেই পূজা উপলক্ষে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা বা চড়ক মেলা।

মিষ্টি, মিঠাই, আইসক্রিম, গজা, রসমন্ডি, পাপড় ভাজা, জিলাপি সহ নানা ধরণের খাবারের পসার নিয়ে বসেন দোকানীরা। এছাড়াও কুটির শিল্প দ্রব্য হিসাবে বাঁশের, বেতের, মাটির নানা রকমের ব্যবহার সামগ্রী এই মেলাতে বিকিকিনি হয়। মেলাতে মনোহরী দ্রব্যাদির বেচাকেনাও কম হয় না। সাতক্ষীরা শহরে গুড়পুকুরের মেলার পরেই এ মেলাটি বৃহত্তম। জেলা শহর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরের এ মেলাতে গ্রামের ধর্মমত নির্বিশেষে অসংখ্য নারী-পুরুষের সাথে যুক্ত হয় শহরের অনেকেই। চৈত্র সংক্রান্তির বা চড়ক মেলার প্রধান আকর্ষণ বড়শি বিদ্ধ হয়ে চড়ক কাঠে ঘোরা। জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ এ আয়োজনটি ক্রমশঃ জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে।

 

রাখাল তলার মেলা

একশ’ বছরেরও আগের কথা। এ মাঠের জমি তখন এক ফসলী। ফসল বা ধান কাটা হয়ে গেলে বাকী সারা বছর জমি প্রায় পড়ে থাকে। নানা রকম ঘাস-আগাছা জন্ম নেয়। এলাকার রাখালেরা গরু-ছাগল চরায়। কখনও বা তরমুজ চাষ করা হতো এ মাঠে। গরু চরাণোর ফাঁকে ফাঁকে তরমুজ ক্ষেত দেখাশুনা করা, তরমুজ খাওয়া এমনকি তরমুজ নিয়ে খেলাও করতো রাখালেরা। একদিন খেলার অবসরে তাদের মাথায় এলো বড় রাখালের কথা। যিনি ধেনু বৎস চরাতেন হাতে নিয়ে কারুকার্য খচিত বাঁশের বাঁশি। তিনি আর কেউ নন, রাখাল সর্দার শ্রীকৃষ্ণ। তরমুজ দিয়েই তাঁকে পূজা দেয়া শুরু হল। রাখালতলার রাখালেরা প্রতি বছর বৈশাখের শেষ দুই দিন এই পূজা দেয়া শুরু করল। আর পূজা উপলক্ষে শুরু হল মেলা। রাখালতলায় রাখাল ঠাকুরের মেলা।

ফাঁকা বিলের মাঝখানে বট ছায়ায় কুঁড়েঘরে সহচরী রাধাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শ্রীকৃষ্ণ। প্রতি বছর বৈশাখের শেষ দুই দিন অদূরবর্তী চারিদিকের গ্রামগুলো থেকে অসংখ্য নর-নারী আসেন যুগল প্রতিমাকে পূজা দিতে। দূর-দূরান্ত থেকে দোকানীরা আসেন নানা রকম পসার নিয়ে। রসমন্ডি, বাতাসা, জিলাপী, পাঁপড়, তালের শাস, গজা বিভিন্ন মিষ্টি সহ হরেক রকমের খাবার। আছে নাগরদোলা, চাকতি ঘোরানো, রিং ছুড়ে সাবান পাউডার জিতে নেয়ার সুযোগ। কাঠ বেত বাঁশের আসবাবপত্র, শিশুদের খেলনা সামগ্রী। আর আছে কিশোরী তরুণীদের চুড়ি, ফিতে, পাউডার সহ সুন্দর হওয়ার নানান উপকরণ। শেষ বিকেলের মজাটাই আলাদা। চারিদিকের গ্রামগুলো থেকে দলবদ্ধ-সারিবদ্ধ হয়ে এঁকে বেঁকে রওনা হয় শত শত সব বয়সী মেলার্থী-পূজারী। তখন আর ধর্মের সীমাবদ্ধতা ওদের বেঁধে রাখতে পারে না। জায়গাটি হয়ে ওঠে মানুষের মিলন মেলা। রাধাকৃষ্ণের প্রেম যেন মানব-মানবীর চিরায়ত প্রেমের প্রতীক হয়ে ওঠে। ধর্মের বিভিন্নতা ভুলে গিয়ে ওরা কয়েক গ্রামের মানুষ একত্র হয় মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্ম প্রেমের ছায়াতলে।

পরাণদহা, নেবাখালি, গোদাঘাটা, জগন্নাথপুর, বারোপোতা, শিয়ালডাঙ্গা ও সোনারডাঙ্গা গ্রামের মাঝখানে অবস্থিত রাখালতলার এই মেলাটি। সাত গ্রামের মাঝে ফাঁকা বিলের মধ্যে।

বর্তমান রাখাল ঠাকুরের এই ক্ষুদে মন্দিরটি দেখাশোনা করছেন পুরোহিত কিরণ চন্দ্র ভট্টাচার্য। তথ্যগুলো তিনিই দিলেন। সাতক্ষীরা সদর বাস টার্মিনাল থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৯ কিলোমিটার। সার্কিট হাউসের পাশ দিয়ে সোজা পশ্চিমে যেতে হবে।

 

তালা উপজেলায় বৈশাখী মেলা

তালা উপজেলার উপজেলা কমপ্লেক্সে বিগত প্রায় দু’দশক ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বৈশাখী মেলা। তালা গণসাংস্কৃতিক কেন্দ্র আয়োজিত এ মেলাটি তালা উপজেলার একটি উল্লেখযোগ্য মেলা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

 

 

 

দেবহাটা উপজেলা

দেবহাটা উপজেলার এক পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ইছামতি নদী। নদীর এ পাশে বাংলাদেশ আর ওপাশে ভারত। দুর্গাপূজার সময় দু’পাশের দু’দেশের হিন্দু সম্প্রদায় এই নদীতে প্রতিমা বিসর্জন করে। এ উপলক্ষে ধর্ম-মত নির্বিশেষে দু’বাংলার অসংখ্য মানুষের ঢল নামে এখানে। উৎসব আনন্দে মানুষের যাওয়া আসার মধ্য দিয়ে ক্ষণিক সময়ের জন্য সীমানা একাকার হয়ে যায়। নদীর বুকে বসে উচ্ছ্বাসের হাট। সেই সুযোগে কিছু দোকানীও পসার সাজিয়ে বসে। সৃষ্টি হয় আনন্দ মেলা। পরিণত হয় দু’বাংলার মিলনমেলায়।

 

কলারোয়া উপজেলার বৈশাখী মেলা

কলারোয়া উপজেলা থেকে ৫ কিলোমিটার পূর্বে কয়লা গ্রাম। এই গ্রামেই কয়লা মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে বসে শতাব্দী প্রাচীন বৈশাখী মেলা। অবশ্য পুরাতন দিনপঞ্জী অনুযায়ী ১লা বৈশাখে এই মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমান আমাদের দেশে প্রচলিত বাংলা দিনপঞ্জী অনুযায়ী এটি পড়ে ২ বৈশাখ। সাধারণতঃ মেলাগুলো হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন পূজা উপলক্ষে হয়ে থাকলেও এ মেলাটি তার ব্যতিক্রম। এ মেলার আয়োজক প্রধানতঃ মুসলিম সম্প্রদায়। মূল মেলা একদিনের অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ হলেও বাংলা নববর্ষের কয়েকদিন ধরে এর রেশ চলতে থাকে।

 

 

শ্যামনগর উপজেলা

 

রাস মেলা

শ্যামনগর উপজেলায় বেশ কয়েকটি মেলা হয়ে থাকে। আড়পাঙ্গাশিয়া ও পোড়াকাটলা গ্রামে বহুদিন ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে রাসমেলা। শ্রীশ্রী কৃষ্ণের রাসযাত্রা উপলক্ষে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয় রাস পূর্ণিমা অর্থাৎ আশ্বিন কিংবা কার্তিক মাসের পূর্ণিমাতে।

 

বারুণি, চড়ক ও বনবিনির মেলা

ফাল্গুন মাসে সোনার মোড়ে অনুষ্ঠিত হয় বারুনির মেলা। তিন চারদিন ধরে চলে এ মেলাটি।

মুন্সিগঞ্জে অনুষ্ঠিত হয় চৈত্র সংক্রান্তির চড়ক মেলা।

কালিঞ্চীতে মাঘ মাসে বসে বনবিবির মেলা। এছাড়াও আদিবাসী মুন্ডা সম্প্রদায় নিজেদের মধ্যে মেলা বসায়।

 

 

কালীগঞ্জ উপজেলা

 

কালীগঞ্জ উপজেলার দুদুলিতে বারুনির মেলা, মৌতলায় ফকির ও চড়ক মেলা। নেঙি-ফরিদপুরে আহসান বিবির মেলা, কাটুনিয়া ও বিষ্ণুপুরে দোলযাত্রার মেলা অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু বর্তমানে এ সকল মেলাগুলো আর নেই। এখনও যেটি টিকে আছে সেটা হলো কুশলিয়ার রথের মেলা। শতাব্দী প্রাচীন এ মেলাটি রথযাত্রা উপলক্ষে হয়ে থাকে। রথযাত্রা ও উল্টোরথ যাত্রা উভয় দিনই মেলাটি পরিপূর্ণ লোকজ আবহে অনুষ্ঠিত হয়। লোকশিল্প সামগ্রীই এ মেলার প্রধান আকর্ষণ।

এছাড়াও ঈদ ও দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কালীগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় ২/৩ দিনের মেলা বসে। মিষ্টি মিঠাই আর মনোহারী দ্রব্যাদি এ মেলাগুলোতে বেশী পাওয়া যায়। প্রায় প্রতিটি পূজামন্ডপকে ঘিরে পূজার মেলা। বসন্তপুর ঈদগাহের পাশে ঈদুল ফিতরের সময় বসে ঈদের মেলা।

 

ওরশ শরীফ উপলক্ষে মেলা

কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা গ্রামে হয় ওরশ শরীফ। অবিভক্ত বাংলার শিক্ষা বিভাগীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন সুফী সাধক খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নলতায় ৮, ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি ওরশ শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অসংখ্য ভক্ত এবং পন্ডিত আলেমরা এখানে আসেন। এই ওরশ শরীফ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয় মেলা বা বাজার। শীতবস্ত্র, মিষ্টিসহ বিভিন্ন দ্রব্যাদি এখানে বেচাকেনা হয়। হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষের ঢল নামে। এখানেও বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পূণ্য কামনায় হাজির হন।

 

শ্মশান মেলা

কালীগঞ্জে অনুষ্ঠিত হয় শ্মশান মেলা। মাঘ মাসের অমাবস্যার দুই দিন এই মেলা চলে শ্মশান ঘাটে। বেত, বাঁশ ও মৃৎশিল্পসহ লোকশিল্পের সমাহার ঘটে এখানে।

 

 

 

আশাশুনি উপজেলা

 

আশাশুনি উপজেলার মেলাগুলির মধ্যে অন্যতম বৈশাখী মেলা। আড়ম মেলা, ফকির মেলা, রথের মেলা ও ওরশ উপলক্ষে মেলা বা বাজার হয় এখানে।

 

আড়ম মেলা

আড়ম মেলা দুর্গাপূজা উপলক্ষে হয়ে থাকে উপজেলার বুড়িয়া গ্রামে। বুড়িয়া গ্রামের পার্শ্ববর্তী পনের থেকে বিশটি মন্ডপের দুর্গা প্রতিমা একত্র করে একই সাথে বিসর্জন করা হয়। কয়েক হাজার মানুষ এখানে সমবেত হন। অসংখ্য নৌকা নামে নদীতে, গোটা এলাকা হয়ে ওঠে উৎসবের আমেজে মাতোয়ারা।

এছাড়াও দুর্গাপূজা উপলক্ষে মেলা অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণ বড়দল ও বুধহাটা কাছারী বাড়ীতে।

 

ফকির মেলা

ফকির মেলা হয়ে থাকে বুধহাটা বাজারের উত্তর পাশে অবস্থিত বুড়োপীরের দরগাকে ঘিরে। প্রতি চৈত্র মাসে এটি অনুষ্ঠিত হয়। ধাতব পদার্থ নির্মিত পঞ্চপাঞ্জা হাতে নিয়ে গ্রাম ঘুরে সাহায্য সংগ্রহ করে এই দরগার খাদেমেরা। তারপর তারা মেলার আয়োজন করেন।

 

রথের মেলা

অন্যান্য অনেক স্থানের ন্যায় আশাশুনিতেও আষাঢ় মাসের ৭ ও ১৪ তারিখ রাত-দিন ধরে রথের মেলা বসে। এখানে একটা বড় ধরণের গাছ আছে। এ গাছের নাম কেউ বলতে পারে না। অচেনা গাছ। তাই সবাই একে অচিন গাছ নামে ডাকে। এই গাছতলায় বসে রথের মেলা। সমাগম ঘটে অসংখ্য মানুষের। মৃৎপাত্র, খেলনা সামগ্রী, কাঠের ফার্নিচার, গাছের চারা কলম এখানের মেলায় ওঠে।

 

বৈশাখী মেলা

বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয় বড়দল বাজার সংলগ্ন মাঠে। সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠিত এ মেলায় লোকশিল্পের পাশাপাশি আধুনিকতার সংমিশ্রণ ঘটে। লোক সঙ্গীতের সাথে আধুনিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সমন্বয়করণ হয় এখানে। আশাশুনি উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় সাহিত্য সংস্কৃতির ব্যক্তি ও সংগঠন এ মেলার উদ্যোগ গ্রহণ করে। কুটির শিল্প ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মেলা জমে ওঠে।

 

ওরশ শরীফ উপলক্ষে মেলা

ওরশ শরীফ উপলক্ষে মেলা বা বাজার বসে গুণাকরকাটিতে। খানকায়ে আজিজিয়াতে প্রতি বছর ৩ ফাল্গুন অনুষ্ঠিত হয় ওরশ শরীফ। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসেন অসংখ্য ভক্ত মুরিদ। মাদ্রাসা মাঠে ও সংলগ্ন এলাকায় বসে মেলা। মাটি, কাঠ, লোহা, টিনের ব্যবহার সামগ্রী ছাড়াও এখানে পাওয়া যায় কম্বল, কাপড় চোপড়, টুপি, হাজী রুমালসহ স্টেশনারী দ্রব্যাদি। বিভিন্ন ধরণের মিষ্টি, মিঠাই, হোটেল রেস্তোরাঁ থাকে এখানে। মেলা চলে প্রায় মাসখানেক, ওরশ হয় তিনদিন ধরে।

 

দুবলা চরের মেলা সাতক্ষীরাতে না হলেও সাতক্ষীরার মানুষের মধ্যে এর প্রভাব খুব বেশী। সাতক্ষীরার অসংখ্য মানুষ এ মেলায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। ফরিদপুরের একটি মেলাতেও সাতক্ষীরার অনেকেই যোগদান করেন। এছাড়াও জেলা সদরে বিভিন্ন সময়ে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন মেলার। তার মধ্যে বৈশাখী মেলা, বইমেলা, বৃক্ষমেলা, কৃষি মেলা, বাণিজ্য মেলা, লিটল ম্যাগাজিন মেলা, নাট্যমেলা, সাহিত্য মেলা, কম্পিউটার মেলা, শিশু মেলা প্রভৃতি। এ সকল মেলাগুলোতে লোকজ আদলের সাথে সংমিশ্রণ ঘটে আধুনিকতার। কোন কোনটা সম্পূর্ণ আধুনিক দ্রব্যাদিতে এবং শহুরে হয়ে ওঠে। সেখানে থাকে না লোকশিল্প, কুটির শিল্পের ছোঁয়া। তারপরও এখন পর্যন্ত সাতক্ষীরার যে মেলাগুলো সবচেয়ে প্রাণবন্ত, স্বতঃস্ফূর্ত সেগুলো লোকজ মেলা, গ্রামীণ মেলা। মেলার মূল আবহটি সেখানেই পরিস্ফুট হয়।