মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

এলাকার মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনা

মংলা এবং চালনার নদীবন্দরে বার বার জাহাজ ডুবির ফলে পাকিস্তানী বাহিনী যেমন সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে, সাথে নিরাপত্তার জন্য তারা নদীতে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে । শত্রু বাহিনী স্থানীয়ভাবে অনেকগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীণ বৃহ.. লঞ্চ রিকুইজিশন করে সেগুলোকে খুলনা শিপইয়ার্ড থেকে কিছু রুপান্তর করে ৫ কিলোমিটার কামান ও হেভী মেশিনগান বসিয়ে গানবোটে রুপান্তর করে নিরাপত্তা রক্ষার কাজে লাগায় । স্থলভাগেও হানাদার বাহিনী কম্বিং অপারেশন শুরু করে । ফলে নৌকমান্ডোদের কৈলাশগঞ্জ থেকে তাদের আশ্রয়স্থল বদল করে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সরে যেতে বাধ্য হয় ।
সাতক্ষীরার কুলিয়ার শ্রীরামপুর ব্রীজ ।যুদ্ধাকালীন বিজয়ের পথে মেজর জলিল ডানে, মাঝে জেনারেল ওসমানে এবং বামে ক্যাপ্টেন হুদা (জুলাই ১৯৯৭১)
অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে এ এলাকায় সেনাশক্তি বৃদ্ধির জন্য সাবমেরিনার ও নৌপ্রশিক্ষণ ঘাটির অন্যতম সংগঠক লে: গাজী মো: রহমতউল্লাহর নেতৃত্বে আরো ৩০জন নৌকমান্ডোসহএকটি মুক্তিযোদ্ধা দল মংলা এলাকায় পাঠানো হয় । পূর্ব দলের সাথে এই দলের সমন্বয় এবং স্থল যোদ্ধাদের সাথে সমন্বিত হওয়ায় খুলনার দক্ষিণ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি অনেকগুনে বেড়ে যায় । গড়ে ওঠে একটি বৃহ.. মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন । অত:পর গাজী রহমতউল্লাহর নেতৃত্বে ছাত্র নেত্রীবৃন্দ সমন্বিত যুদ্ধ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং সাতক্ষীরা ও খুলনার দক্ষিণাঞ্চলে শত্রুঘাটি একের পর এক মুক্ত করতে থাকেন ।
সেই সময়ে আশাশুনি থানায় রাজাকারদের শক্তি এবং অত্যাচার বহুগুনে বেড়ে যায় । ফলে এই সমন্বিত বাহিনী আশাশুনি থানা দখলের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন । সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় আশাশুনি থানা দখলে আনা সম্ভব হলে সাতক্ষীরা জেলার দক্ষিণাঞ্চল মুক্ত অঞ্চলে পরিনত হবে । এতে এলাকায় তঁাদের গতি অবাধ ও নির্বিঘ্ন হবে । সে অবস্থায় মংলাসহ অন্য নৌবন্দরগুলোতে নৌকমান্ডদের অপারেশন চালানো অনেক সহজ হবে, এমন মনে করে সমন্বিত মুক্তিযোদ্ধা ও নৌকমান্ডো বাহিনী আশাশুনি থানা দখলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন । এই উদ্দেশ্যে যাবতীয় পরামর্শ এবং প্রস্তুতি শেষ করে ৬ অক্টোবর রাতে সম্মিলিত আক্রমন চালানো হয় আশাশুনি থানার ওপর ।
কিন্তু শত্রুবাহিনীর নিরাপত্তা রক্ষার্থে এখানে থানার ছাদসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন বাড়ির ছাদেও সুরক্ষিত বাঙ্কার বানিয়ে রেখেছিল । সারারাত যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর এগারোজন যোদ্ধঅ মারাত্নকভাবে জখম হয় । সেদিন প্রচন্ড যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন মেজর সামছুল আরেফিন, লে: গাজী মো. রহমতউল্লাহ, খিজির আলী, কামরুজ্জামান টুকু, স ম বাবর আলী ও শেখ আ. কাইয়ুম।
প্রথম দিনের যুদ্ধে তানা দখল সম্ভব না হলেও মুক্তিবাহিনী নেতৃবৃন্দ নিরাশ না হয়ে পরিকল্পিতভাবে পরদিনই আবার আশাশুনি থানায় আক্রমণ পরিচালনা করেন । এদিন নৌ-কমান্ডোরা জীবনের ঝুকি নিয়ে অপর পারে থানার ঘাটে ভাসমান ফেরি পণ্টুনে ৪টি মাইন বিস্ফোরণ ঘটান । প্রলয়ংকরী শব্দে ৩-৪টি মাইনের বিস্ফোরণ ঘটায় সমগ্র ফেরীঘাট তছনছ হয়ে যায় । এক একটি লোহার পাত ৫০-১০০ গজ দুরে ছিটকে পড়ে । নদীর পানি পাহাড়ের মতো রুপ নিয়ে ৩০ খেবে ৪০ ফুট ওপরে ওঠে । এই দৃশ্য দেখে শত্রু সৈন্য এবং রাজাকার অবস্থান ছেড়ে পালাতে থাকে । ১১ জন পাকসেনা এবং ৪০ জন রাজাকার নিহত হয় । মুক্তিবাহিনী ৪ দলে বিভাক্ত হয়ে থানা আক্রমণ করে । ফলে দখলদার বাহিনী ও রাজাকার যারা থানা এবং বাঙ্কারে ছিল, ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করে । কমান্ডো জিএমএ গফ্ফারের নেতৃত্বে ১০-১২ জনের একটি দল আশাশুনি-সাতক্ষীরা সড়কের মাঝে একটি ব্রিজ এক্সপ্লোসিভ দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে সেখানে কাট অফ পার্টির দায়িত্ব পালন করেন । মুক্তিবাহিনীর সদস্য খিজির আলী এই যুদ্ধে শত্রু বাহিনীর সামনেই দন্ডায়মান অবস্থায় দুটি এল.এল.জি বগলে চেপে গুলি ছুড়তে ছুড়তে থানায় গিয়ে ওঠেন । রাজাকার এবং পাকিস্তানি সৈন্যরা তার ভয়াল মূর্তি দেথে অস্ত্রশস্ত্র ফেলেই পালাতে শুরু করে । এদিন আশাশুনি থানার পতন ঘটে। পাকবাহিনী পালিয়ে সাতক্ষীরা সদরে আশ্রয় গ্রহণ করে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সালিক এই সাফল্যের জন্য রহমতউল্লাহ সাহেবকে অভিনন্দিত করেন । উল্লেখযোগ্য, ব্রিগেডিয়ার সালিক তাকে রণাঙ্গনে পাটিয়েছিলেন । পরদিন পাকিস্তানী বাহিনী হেলিকপ্টার নিয়ে এ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ শুরু করে । পাকবাহিনী হেলিকপ্টার থেকে নিরীহ গ্রামবাসীর ওপর বৃষ্টির মতো গুলি ও বোমা ফেলতে থাকে । ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের পিছু হটে সুন্দরবনে আশ্রয় নিতে হয় । আশাশুনি থানার পতন হলে মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার বাঙ্গার থেকে ১০-১২ জন বাঙালি যুবতীকে উদ্ধার করে। এই যুদ্ধে ৪০জন রাজাকার বন্দি হয় ।